আধুনিক জীবনের গতি যত বেড়েছে, মানুষের মানসিক ক্লান্তিও তত গভীর হয়েছে। কর্মচাপ, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও যান্ত্রিক জীবনব্যবস্থা মানুষকে প্রতিনিয়ত বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে প্রকৃতি ও নিজস্ব সত্তা থেকে। এই বাস্তবতায় ভ্রমণ হয়ে উঠেছে কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং মানসিক সুস্থতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ভ্রমণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে। পরিচিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি ও ভিন্ন জীবনধারার সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের চিন্তাজগৎ সমৃদ্ধ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত ভ্রমণ মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক এবং কর্মক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বাড়ায়। তাই ভ্রমণ আজ আর বিলাসিতা নয়, এটি সুস্থ জীবনের এক বাস্তব প্রয়োজন।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যগত বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। পাহাড়, সমুদ্র, বনাঞ্চল, নদী ও ঐতিহাসিক স্থাপনা—সব মিলিয়ে দেশটির পর্যটন সম্ভাবনা অত্যন্ত বিস্তৃত। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সৌন্দর্য কিংবা মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের ঐতিহাসিক নিদর্শন—প্রতিটি স্থানই পর্যটকদের কাছে ভিন্নমাত্রার অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
ভ্রমণ শিল্প দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশে পর্যটন খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বিস্তার গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করছে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।
তবে ভ্রমণের সঙ্গে দায়িত্ববোধের বিষয়টি অবিচ্ছেদ্য। অপরিকল্পিত ও অসচেতন পর্যটন পরিবেশ দূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় এবং স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যটকদের উচিত পরিবেশবান্ধব আচরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
ভ্রমণ মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ বাড়ায়, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে। ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে বিভেদ কমে, গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। এই সামাজিক ইতিবাচক প্রভাব একটি সুস্থ ও সচেতন জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সবশেষে বলা যায়, ভ্রমণ জীবনের এক প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ—যা মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। পরিকল্পিত, দায়িত্বশীল ও সচেতন ভ্রমণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিন ক্ষেত্রেই এর সুফল সুদূরপ্রসারী হবে।
কায়েস মাহমুদ,সম্পদক, দৈনিক দেশান্তর ১২.০১.২০২৬ইং




















