সময় বড় নিষ্ঠুর নয়, মানুষই সময়কে নিষ্ঠুর করে তোলে। প্রতিদিন সূর্য ওঠে, আলো ছড়ায়, আবার অস্ত যায়—কিন্তু মানুষের ভেতরের অন্ধকার কি সত্যিই কমে? সভ্যতার চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা আজও আদিম প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত। প্রযুক্তি এগিয়েছে, দালান উঁচু হয়েছে, কিন্তু মানুষের বিবেক কি সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছে?
আমরা কথা বলি নৈতিকতার, অথচ স্বার্থের প্রথম ডাকেই নৈতিকতা পেছনে পড়ে যায়। মুখে মানবতা, হাতে হিসাব; ভাষণে সত্য, আচরণে সুবিধা—এই দ্বৈততা আমাদের সমাজকে নিঃশব্দে ক্ষয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এই ক্ষয়কে আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি।
এক সময় মানুষ প্রশ্ন করত—“আমি কে?” এখন প্রশ্ন বদলে গেছে—“আমার লাভ কী?” এই পরিবর্তন শুধু চিন্তার নয়, এটি আত্মার অবক্ষয়। সমাজ যখন লাভ-লোকসানে ভাগ হয়, তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না; হয়ে ওঠে সংখ্যা, পরিসংখ্যান, কিংবা ব্যবহারযোগ্য বস্তু।
আমরা ভুলে যাচ্ছি, সভ্যতা গড়ে ওঠে শক্তিতে নয়, বিবেকে। ইতিহাসের প্রতিটি অন্ধকার অধ্যায়ই সাক্ষ্য দেয়—যখন বিবেক ঘুমিয়ে পড়ে, তখনই জন্ম নেয় ভয়াবহতা। অথচ বিবেকের সবচেয়ে বড় শত্রু কোনো বাহ্যিক শক্তি নয়, বরং আমাদের নিজেদের নির্লিপ্ততা।
আজকের মানুষ ব্যস্ত—কিন্তু ভাবনায় নয়, দৌড়ে। সে থামে না, কারণ থামলে প্রশ্ন আসতে পারে। প্রশ্ন এলে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে। আর আয়নায় তাকানোই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ।
এই সমাজে পরিবর্তন আসবে আইন দিয়ে নয়, স্লোগানে নয়—পরিবর্তন আসবে মানুষের ভেতর থেকে। একটি সচেতন মন, একটি দায়বদ্ধ হৃদয়, একটি প্রশ্নবোধক বিবেক—এগুলিই পারে সময়ের গতিপথ বদলাতে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো জাতিকে বিচার করে তার ক্ষমতার জন্য নয়, বিচার করে তার নীরব মুহূর্তগুলোতে সে কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল—তার ভিত্তিতে। প্রশ্ন শুধু একটাই: আমরা কি সেই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত?
সম্পাদকীয়,
কায়েস মাহমুদ, দৈনিক দেশান্তর, ০৬.০১.২০২৬ ইং



















