সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় রাজনীতির গতিপথ, সিদ্ধান্ত ও উত্তেজনার প্রতিফলন আজ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান আঞ্চলিক রাজনীতিতেও। কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের রাজনীতিও আজ একই স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের রাজনীতির কাঠামো ও চরিত্র নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
আঞ্চলিক রাজনীতি মূলত জনগণের সবচেয়ে কাছের রাজনৈতিক পরিসর। এখান থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে, জনস্বার্থের দাবি উত্থাপিত হয় এবং গণতন্ত্রের চর্চা বিস্তৃত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক রাজনীতি উন্নয়ন ও সেবার চেয়ে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। দলীয় পরিচয়ের আড়ালে ব্যক্তিগত বলয় সৃষ্টি, আনুগত্যের রাজনীতি এবং ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতা স্থানীয় রাজনীতির স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে।
রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র, সুশাসন, জাতীয়তাবাদ কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো আদর্শগুলো আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এসব আদর্শ কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে—সে প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। আঞ্চলিক পর্যায়ে মতাদর্শ অনেক সময় বক্তৃতা ও পোস্টারের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তব কর্মসূচিতে তার প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো জনগণের প্রত্যাশা। সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতির কাছে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তা চায়। তারা চায় এমন নেতৃত্ব, যারা বিভাজনের নয় বরং সমন্বয়ের রাজনীতি করবে। কিন্তু রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব, ভিন্নমতের প্রতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সেই প্রত্যাশা পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তরুণ সমাজের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। দেশের একটি বড় অংশ তরুণ হলেও রাজনীতিতে তাদের সক্রিয় ও গঠনমূলক অংশগ্রহণ আশানুরূপ নয়। রাজনীতিকে অনেকেই এখন আদর্শচর্চার ক্ষেত্র নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবাদী পরিসর হিসেবে দেখছে। এই মনোভাব ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য শুভ নয়। আঞ্চলিক রাজনীতি যদি তরুণদের জন্য চিন্তা, নেতৃত্ব ও সেবার একটি ইতিবাচক ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, তবে জাতীয় রাজনীতিও তা থেকে উপকৃত হবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক সংস্কার ও আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা। আঞ্চলিক রাজনীতিকে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব না দিলে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান রাজনীতি আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—শুধু ক্ষমতার হিসাব নয়, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হতে হবে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও সমাজের স্থিতিশীল অগ্রগতি। জাতীয় ও আঞ্চলিক—উভয় পর্যায়ে আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করাই হবে ভবিষ্যৎ রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং দায়ি
কায়েস মাহমুদ, সম্পাদক, দৈনিক দেশান্তর, ০৫.০১.২০২৬ ইং



















