শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের ভেতরে বন্দি কোনো বস্তু নয়, বরং এটি মানুষ গড়ার এক অবিরাম প্রক্রিয়া। কিন্তু আধুনিক প্রতিযোগিতার যুগে আমরা কি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছি? সম্প্রতি রাশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার একটি দর্শন আমাদের এই গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সেখানে পরীক্ষার খাতায় কোনো শিক্ষার্থীকে ‘শূন্য’ দেওয়া হয় না; সর্বনিম্ন নম্বর ধরা হয় ‘২’। এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে এক বৈপ্লবিক দর্শন—একজন শিক্ষার্থী যখন প্রতিকূলতা জয় করে শ্রেণিকক্ষে আসে, তার সেই অস্তিত্ব ও চেষ্টাকে কোনোভাবেই ‘শূন্য’ বলা যায় না।
মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. থিওদর মেদ্রায়েভের ভাষায়, “শূন্য মানে যার কোনো অস্তিত্ব নেই।” একজন শিক্ষার্থী যখন প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, শীত-গ্রীষ্মের ক্লান্তি উপেক্ষা করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শিক্ষাঙ্গনে হাজির হয়, তখন তার সেই সংগ্রামকে অস্বীকার করার অধিকার কারো নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ‘শূন্য’ এখন ভয়ের এক প্রতীক। খাতার পাতায় একটি বৃত্তাকার শূন্য দেখে বহু শিক্ষার্থী নিজের ওপর আস্থা হারায়, নিজেকে সমাজ ও পরিবারের কাছে অযোগ্য ভাবতে শুরু করে। অথচ শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল মানুষকে পুনরায় উঠে দাঁড়াতে শেখানোর মন্ত্র।
বিশ্বের সফলতম শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ফিনল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো নম্বরকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার বদলে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সেখানে শিক্ষার্থীকে একটি ‘নম্বর পাওয়ার যন্ত্র’ হিসেবে নয়, বরং আগামীর সুনাগরিক হিসেবে দেখা হয়। তাদের দর্শন হলো—মানবিক শিক্ষক ছাড়া মানবিক শিক্ষা সম্ভব নয়। তাই সেখানে শিক্ষকদের মর্যাদা ও প্রশিক্ষণকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আজ বড় বেশি প্রয়োজন পরীক্ষানির্ভরতা কমিয়ে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো। শিক্ষার্থীর প্রচেষ্টা ও মেধাকে কেবল নম্বরের মানদণ্ডে বিচার না করে, তাদের সুপ্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত করার পথ প্রশস্ত করতে হবে। রাশিয়ার সেই দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যতক্ষণ চেষ্টা করছে, সে ব্যর্থ নয়।
শূন্য মানেই সমাপ্তি, আর শিক্ষা কখনো শেষের কথা বলে না। শিক্ষা বলে—“তুমি পারবে, আবার চেষ্টা করো।” এই অনুপ্রেরণাই হোক আমাদের আগামীর শিক্ষানীতির মূল ভিত্তি। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা, স্বপ্ন দেখাতে শেখানো এবং তাকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
কায়েস মাহমুদ, দৈনিক দেশান্তর,০৭-০১-২৬ইং




















